বর্তমান ভারত হচ্ছে ডিজিটাল যুগ এই ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল পেমেন্টে আসছে বড় পরিবর্তন। RBI এর নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী আর ফ্রিতে UPI ব্যবহার করা যাবে না। এবার থেকে UPI এর মাধ্যমে ট্রানজেকশন করতে গেলে দিতে হবে আপনাকে অতিরিক্ত চার্জ। এতদিন ধরে ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লব এনেছে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI)। কয়েক বছরের মধ্যে এটি খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলে এমনকি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল ট্রানজেকশনের এই পদ্ধতি। প্রতিটি মানুষ টাকা পাঠানো বা গ্রহণের জন্য UPI ব্যবহার করছেন। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি লেনদেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এর জন্য RBI এর প্রচুর ক্ষতের সম্মুখীন হয় তাই সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই ‘বিনামূল্যের’ যুগ হয়তো আর বেশি দিন চলবে না। প্রশ্ন উঠছে—UPI ব্যবহার করতে গেলে কি এখন থেকে গ্রাহকদেরও চার্জ দিতে হবে? প্রতিটি ট্রানজেকশনে কেমন চার্জ দিতে হবে? দিনে কতগুলি ট্রানজেকশন করা যাবে? চলুন সমস্ত কিছু বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।

UPI লেনদেনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা খরচ
আমরা যখন Google Pay, PhonePe, Paytm কিংবা অন্য কোনও অ্যাপ ব্যবহার করে টাকা পাঠাই, তখন ব্যবহারকারীদের কোনও অতিরিক্ত ফি দিতে হয় না। তবে আমাদের কোন অতিরিক্ত চার্জ না দিতে হলেও এর মানে এই নয় যে UPI সম্পূর্ণ খরচবিহীন। প্রতিটি লেনদেনের পিছনে ব্যাঙ্ক, NPCI এবং পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলিকে আলাদা আলাদা খরচ বহন করতে হয়। এর ফলে প্রতিদিন প্রচুর টাকা লস হয়ে যাচ্ছে।
- পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন PhonePe, GPay, Paytm): সার্ভার চালানো, ব্যান্ডউইথ, সাইবার সিকিউরিটি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই এখন থেকে আর বিনামূল্যে বা ফ্রিতে ট্রানজেকশন করানো যাবে না।
- NPCI (ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া): যেটি UPI সিস্টেমের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তাদের বিশাল ডেটা সেন্টার দিনে হাজার হাজার কোটি লেনদেন প্রক্রিয়া করে। এটি পরিচালনা করতেও প্রচুর খরচ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি লেনদেনের পিছনে NPCI-এর খরচ গড়ে ৬০ থেকে ৭০ পয়সা। তাই এবার এই টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হবে।
- ব্যাঙ্কগুলো: প্রেরক ও প্রাপকের অ্যাকাউন্ট যাচাই, ব্যালেন্স পরীক্ষা, টাকা স্থানান্তর ও SMS অ্যালার্ট পাঠাতে গড়ে প্রতিটি লেনদেনে প্রায় ১২ পয়সা খরচ হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় সফটওয়্যার লাইসেন্স, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরোক্ষ খরচ। এই টাকাগুলো এবার থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে প্রতিটি UPI লেনদেনের প্রকৃত খরচ দাঁড়ায় ৮০ পয়সা থেকে ১.৫ টাকা পর্যন্ত।
কেন বাড়ছে চাপ ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলির উপর?
সরকার প্রথম থেকেই ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানোর জন্য UPI লেনদেনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রেখেছে। এর ফলে গ্রাহকরা ব্যাপকভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার শুরু করেন এবং আজ UPI হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা, এর ফলে কম বেশি সকলেই UPI এর মাধ্যমে ট্রানজেকশন করে থাকেন প্রতিদিন। কিন্তু এর আড়ালে যে বিপুল ব্যয়ভার জমছে, সেটি বহন করতে হচ্ছে ব্যাঙ্ক এবং পেমেন্ট কোম্পানিগুলিকে। তাই এবার লেনদেনে আসছে বিরাট পরিবর্তন।
২০২৫ সালের জুন মাসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটির বেশি UPI লেনদেন হচ্ছে। এর ফলে সরকারের তরফ থেকে বা RBI এর তরফ থেকে এর অর্থ, প্রতিদিন প্রায় ৯০ কোটি টাকার খরচ কেবলমাত্র এই লেনদেনের পেছনে যাচ্ছে। বার্ষিক হিসাবে এই খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩২,৮৫০ কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে কোনও সংস্থার পক্ষেই টেকসই নয়। তাই এবার এই টাকা ধার্য করা হবে গ্রাহকদের কাছ থেকে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে কীভাবে হয় ডিজিটাল লেনদেন?
ভারতের মতো আর কোনও বড় অর্থনীতিতে শেষ ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নয়। এতদিন পর্যন্ত শুধুমাত্র ভারতেই বিনামূল্যে লেনদেন করা হতো অন্য কোন দেশে এমন হয় না।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা এশিয়ার বহু দেশে পেমেন্ট প্রসেসরের চার্জ ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয়ের উপরেই ভাগ হয়ে যায়।
- অনেক দেশে অনলাইন লেনদেনে ১% থেকে ৩% পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়।
- ফলে, ভারতের বিনামূল্যে UPI ব্যবস্থা অনেকটাই ব্যতিক্রমী।
RBI-এর নতুন ইঙ্গিত: এবার কি চার্জ আসছে?
ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট কোম্পানিগুলি দীর্ঘদিন ধরে RBI এবং NPCI-এর কাছে অনুরোধ করে আসছে যে অন্তত কিছু ফি ধার্য করতে হবে, না হলে তাদের উপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। অবশেষে RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে UPI আজীবন বিনামূল্যে থাকতে পারবে না। এবার থেকে পেমেন্ট করতে গেলে চার্জ দিতে হবে।
ব্যবহারকারীদের জন্য এর প্রভাব কী হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—যদি গ্রাহকদের UPI লেনদেনে টাকা দিতে হয়, তবে কি তাঁরা আগের মতোই এটি ব্যবহার করবেন?
- ছোটখাটো লেনদেনে মানুষ হয়তো ক্যাশ বা অন্য বিকল্পে ফিরতে পারেন। এক্ষেত্রে তেমন প্রভাব পড়বে না।
- ব্যবসায়ীরা যদি চার্জ বহন করতে না চান, তবে তাঁরা গ্রাহকদের কাছ থেকেই ফি আদায় করতে পারেন। অর্থাৎ প্রতিটি ট্রানজেকশন এর সময় অতিরিক্ত কিছু টাকা চার্জ করতে পারে গ্রাহকদের থেকে।
- এর ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারে কিছুটা ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত চার্জ দিতে হলে অনেকে ট্রানজেকশন নাও করতে পারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যদি ফি খুবই সামান্য রাখা হয় (যেমন ৫০ পয়সা বা ১ টাকা), তবে ব্যবহারকারীরা অভ্যস্ত হয়ে যাবেন এবং তেমন প্রভাব পড়বে না। তবে এমন হলে NPCI এর উপর চাপ অনেকটাই কমবে।
সরকারের দ্বিধা
সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা। তাই সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল এবং তাই প্রথম থেকেই গ্রাহকদের জন্য UPI বিনামূল্যে রাখা হয়েছিল। এখন যদি হঠাৎ করে চার্জ বসানো হয়, তবে সেটি রাজনৈতিকভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই আর অনলাইনে ট্রানজেকশন করতে চাইবে না। এজন্যই সরকার সরাসরি গ্রাহকদের উপর চাপ না দিয়ে ব্যবসায়ী বা পেমেন্ট এগ্রিগেটরদের দিকে তাকিয়ে আছে। এর ফলে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কিছুটা হলেও ঘাটতি হতে পারে।
UPI ভারতের অর্থনীতিকে ডিজিটাল দুনিয়ায় এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ভারতের প্রতিটি মানুষ এর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। শ্রমিক শ্রেণী থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়িক সকলেই UPI ট্রানজেকশন করে থাকেন প্রতিদিন। তবে এর পিছনে যে বিশাল ব্যয়ভার জমছে, তা দীর্ঘদিন ধরে বহন করা সম্ভব নয়। RBI-এর সাম্প্রতিক ইঙ্গিত বলছে, ভবিষ্যতে হয়তো ব্যবহারকারীদেরও কিছুটা খরচ বহন করতে হবে। এখন দেখার বিষয়—সরকার ও RBI কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে।

My name is Bongo Sambad, and I have been involved in content writing for the past four years. I provide various types of informative content for users.