ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় আছেন? মাসে অল্প টাকা জমিয়ে বড় অঙ্কের রিটার্ন পেতে চান? তাহলে ভারতীয় ডাক বিভাগের জনপ্রিয় বিমা প্রকল্প Post Office Gram Suraksha Yojana এখন নতুন করে আলোচনায়। দাবি করা হচ্ছে, মাসে প্রায় ১,৫০০ টাকা বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট সময় শেষে ৩০–৩৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব। অনেকেই বলছেন, রাজ্যের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা জমিয়ে এই স্কিমে বিনিয়োগ করলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের সঞ্চয় গড়ে তোলা যায়।

তবে এই দাবির পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট শর্ত, বয়সভিত্তিক প্রিমিয়াম কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা। চলুন বিশদে জেনে নেওয়া যাক কীভাবে কাজ করে এই স্কিম, কারা আবেদন করতে পারবেন এবং কত বছরে কত টাকা পাওয়া সম্ভব।

গ্রাম সুরক্ষা যোজনা আসলে কী?

গ্রাম সুরক্ষা যোজনা হল ভারতীয় ডাক বিভাগের একটি জীবন বিমা (Life Insurance) প্রকল্প। এটি মূলত গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি। এই স্কিমে বিনিয়োগের পাশাপাশি জীবন বিমার সুরক্ষাও পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বিনিয়োগকারী জীবিত থাকলে মেয়াদপূর্তিতে এককালীন অর্থ পান, আর মৃত্যুর ক্ষেত্রে মনোনীত ব্যক্তি বিমার টাকাসহ বোনাস পান।

এই প্রকল্পের অধীনে ন্যূনতম ১০,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিমা কভার নেওয়া যায়। প্রিমিয়াম মাসিক, ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে জমা করা যায়।

মাসে ১,৫০০ টাকা জমালে কীভাবে ৩৫ লাখ?

অনেক প্রচারে বলা হচ্ছে, মাসে প্রায় ১,৫০০ টাকা জমালে ৩৫ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়। বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করে—

  • বিনিয়োগকারীর বয়স
  • কত বছরের জন্য পলিসি নেওয়া হচ্ছে
  • ম্যাচিউরিটির বয়স
  • ঘোষিত বোনাস রেট

ধরা যাক, ১৯ বছর বয়সে কেউ পলিসি শুরু করলেন এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রিমিয়াম জমা করলেন। ৫৫, ৫৮ বা ৬০ বছর বয়সে ম্যাচিউরিটির অপশন বেছে নেওয়া যায়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ বছর বয়সে ম্যাচিউর হলে প্রায় ৩১.৬০ লক্ষ টাকা, ৫৮ বছরে প্রায় ৩৩.৪০ লক্ষ টাকা এবং ৬০ বছরে প্রায় ৩৪.৬০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব—যার মধ্যে বোনাস অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ, ‘৩৫ লক্ষ টাকা’ একটি আনুমানিক সর্বোচ্চ রিটার্ন, যা নির্দিষ্ট বয়স ও সময়সীমার ভিত্তিতে প্রযোজ্য।

কারা এই স্কিমে আবেদন করতে পারবেন?

এই প্রকল্পে ১৯ বছর থেকে ৫৫ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক আবেদন করতে পারেন। বয়স যত কম, দীর্ঘমেয়াদে প্রিমিয়াম তত কম পড়ে এবং ম্যাচিউরিটির সময় রিটার্ন তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

১৯ বছর বয়সে কেউ যদি ৫৫ বছরের মেয়াদে পলিসি নেন, তাহলে মাসিক প্রিমিয়াম প্রায় ১,৫০০ টাকার আশেপাশে হতে পারে (সঠিক অঙ্ক নির্ভর করবে বিমার পরিমাণের ওপর)। বয়স বাড়লে প্রিমিয়ামের পরিমাণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা দিয়ে বিনিয়োগ—কতটা বাস্তবসম্মত?

রাজ্যের জনপ্রিয় প্রকল্প Lakshmir Bhandar-এর মাধ্যমে বহু মহিলা প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা পান। কেউ কেউ সেই টাকা সঞ্চয় করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবছেন।

যদি কেউ মাসিক প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ নিয়মিতভাবে গ্রাম সুরক্ষা যোজনায় প্রিমিয়াম হিসেবে জমা করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লাইফ ইনস্যুরেন্স পলিসি—মাঝপথে বন্ধ করলে বোনাস কমে যেতে পারে।

ঋণ সুবিধা ও সমর্পণ নীতি

গ্রাম সুরক্ষা যোজনার একটি বড় সুবিধা হলো—পলিসি নেওয়ার চার বছর পর থেকে ঋণ সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ জরুরি প্রয়োজনে পলিসির বিপরীতে লোন নেওয়া সম্ভব।

তিন বছর পর পলিসি সমর্পণ করা গেলেও পাঁচ বছরের আগে বন্ধ করলে বোনাস সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্কিমে বিনিয়োগ করার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

মৃত্যুর ক্ষেত্রে কী সুবিধা?

যদি বিনিয়োগকারী ম্যাচিউরিটির আগে মারা যান, তাহলে মনোনীত ব্যক্তি সম্পূর্ণ বিমা কভার এবং প্রযোজ্য বোনাস পান। ফলে এটি শুধুমাত্র সঞ্চয় প্রকল্প নয়, পরিবারের জন্য আর্থিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।

কখন পুরো টাকাটা হাতে পাবেন?

ম্যাচিউরিটির বয়স ৫৫, ৫৮ বা ৬০—এই তিনটি বিকল্পের মধ্যে যেটি বেছে নেওয়া হবে, সেই বয়সে এককালীন অর্থ প্রদান করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত সুরক্ষা বহাল থাকে, এবং নির্দিষ্ট শর্তে অর্থ ট্রান্সফার করা হয়।

অতএব, ‘৮০ বছর বয়সে ৩৫ লাখ’—এই দাবি নির্ভর করে পলিসির কাঠামো ও নির্বাচিত অপশনের ওপর।

আর্থিক পরামর্শদাতারা বলছেন, পোস্ট অফিসের বিমা প্রকল্পগুলি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও রিটার্ন সম্পূর্ণ নির্ভর করে বোনাস রেট ও দীর্ঘমেয়াদি অবদানের ওপর। তাই বিনিয়োগের আগে নিকটবর্তী ডাকঘর বা অনুমোদিত এজেন্টের কাছ থেকে সঠিক হিসাব জেনে নেওয়া উচিত।

কেবলমাত্র ‘মাসে ১,৫০০ টাকায় ৩৫ লাখ’—এই প্রচার দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো শর্তাবলি বুঝে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

উপসংহার

যাঁরা কম ঝুঁকিতে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও জীবন বিমার সুরক্ষা চান, তাঁদের জন্য গ্রাম সুরক্ষা যোজনা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা নিয়মিত অল্প অঙ্ক সঞ্চয় করতে পারেন, তাঁদের জন্য এটি কার্যকর হতে পারে।

তবে বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক লক্ষ্য, সময়সীমা এবং বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যমগুলি বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে মাসিক ছোট সঞ্চয়ই ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ভরসা হয়ে উঠতে পারে।