ভারতে আধার কার্ড আজ কেবলমাত্র একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। এবার আধার কার্ডে এলো বিরাট পরিবর্তন। সরকারি যে কোন সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পে ভাতা পাওয়া থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, রেল টিকিট বুকিং, সম্পত্তি কেনাবেচা কিংবা স্কুল-কলেজের ভর্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আধার কার্ডে যাতে কোন সমস্যার সম্মুখীন না হতে হয় সেজন্য কেন্দ্র সরকার নিয়ে এসেছে বিশাল বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে তথ্য আপডেট করার জন্য আধার সেন্টারে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, কাগজপত্র জমা দেওয়া, অথবা বারবার যাচাই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া ছিল এক বড় ঝামেলা। এবার থেকে আর কোন ঝামেলা হবে না এবার সেই সমস্যার অবসান ঘটাতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI) আধার ব্যবস্থায় আনছে একাধিক বড় পরিবর্তন, যা নাগরিকদের জীবনে স্বস্তি আনবে। তাই আপনার আধার কার্ড থাকলে এই পরিবর্তনগুলো জেনে নেওয়া দরকার না হলে পরবর্তীকালে সমস্যায় পড়তে পারেন।

Aadhar Card new Rules
Aadhar Card new Rules

আগে আধার কার্ডে নামের বানান ভুল, জন্মতারিখ সংশোধন, ঠিকানা বদল কিংবা মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট আধার কেন্দ্রে যেতে হত। এরপর সেখানে আবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হত। অনেক সময় আবার ভুল করে ভুল তথ্য চলে আসতো। তবে আর ভয় নেই এবার নিজেরাই বাড়িতে বসে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন যেতে হবে না কোথাও। UIDAI জানিয়েছে, নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে এসব সমস্যার অবসান ঘটবে।

এখন থেকে নাগরিকরা ঘরে বসেই আধারের তথ্য আপডেট করতে পারবেন। শুধু আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যানের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে চাইলে আধার সেন্টারে যেতে হবে। বর্তমান এমন নতুন পদ্ধতি আনা হয়েছে যেখানে বাড়িতে বসে সমস্ত কাজ করা যাবে। এর বাইরে নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ বা ফোন নম্বরের মতো তথ্য সরাসরি সরকারি ডেটাবেস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়ে যাবে। এছাড়াও আরো বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

UIDAI-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, আধার আপডেটের ক্ষেত্রে জন্মসনদ, স্কুল ও কলেজের সার্টিফিকেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, প্যানকার্ড এমনকি বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে। কিন্তু এই সমস্ত তথ্য ইতিমধ্যেই সরকারি ডেটাবেসে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে নাগরিকদের আলাদা করে ফটোকপি জমা দেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। এছাড়াও বিভিন্ন তথ্য থেকে সমস্ত কিছু যাচাই করে দেখা হবে, এর ফলে কারো ভুয়ো আধার কার্ড থাকলে সেটি অটোমেটিক বাতিল হয়ে যাবে। এর ফলে ভুয়ো আধার কার্ড তৈরি বা পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।

কিউআর কোড-ভিত্তিক আধার অ্যাপ

UIDAI যে নতুন অ্যাপটি আনছে, সেটির অন্যতম আকর্ষণ হবে কিউআর কোড ফিচার। এবার মোবাইলে একটি অ্যাপ ডাউনলোড করেই আপনি সমস্ত তথ্য ভেরিফাই করে নিতে পারবেন সেখান থেকে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা চাইলে তাঁদের আধারের তথ্য আংশিক (Masked Aadhaar) বা সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালি শেয়ার করতে পারবেন। হাতে করে আর আপনাকে কোথাও আধার কার্ড নিয়ে যেতে হবে না মোবাইল থাকলেই হোটেল চেক-ইন, রেলওয়ে টিকিট যাচাইকরণ কিংবা যেকোনও জায়গায় পরিচয় প্রমাণের ক্ষেত্রে এই কিউআর কোড ব্যবহার করা যাবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকরা নিজের তথ্যের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবেন। তাই তারা চাইলেই কেবলমাত্র তথ্য শেয়ার হবে না হলে কেউ কারো তথ্য চুরি করে অন্য কোন কাজ করতে পারবে না। এর ফলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহারের সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পাবে।

UIDAI-এর সিইও ভুবনেশ কুমার জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই এক লক্ষ মেশিনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার মেশিনে এই নতুন অ্যাপ ইনস্টল করা হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে। পরবর্তীকালে প্রত্যেকের মোবাইলে এটি দেওয়া হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালু হবে। তাঁর দাবি, নাগরিকরা এবার ঘরে বসেই সহজে আধার আপডেট করতে পারবেন এবং আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে না। এছাড়াও আঁধার সংক্রান্ত সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারবেন এখান থেকে।

এবার থেকে সম্পত্তি কেনাবেচা করতে গেলেও আধার কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল। কেন্দ্রীয় সরকার সম্পত্তি লেনদেনের ক্ষেত্রেও আধারের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রায়ই দেখা যায়, জমি বা বাড়ি কেনাবেচায় জালিয়াতি ঘটে থাকে। তাই যাতে কোন জালিয়াতি না ঘটে তার জন্য কেন্দ্র সরকারের এই সিদ্ধান্ত। এবার থেকে সাব-রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার অফিসে আধার যাচাইয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি নিবন্ধন আরও স্বচ্ছ হবে। বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য আধার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হতে পারে। আধার কার্ড না থাকলে আপনি জমি কেনা বা বেচা কিছুই করতে পারবেন না। এর ফলে ভুয়ো দলিল তৈরি বা প্রতারণা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী সুবিধা?

এই নতুন পরিবর্তনের ফলে নাগরিকরা একাধিক সুবিধা পাবেন—

  • আধার কার্ড সঙ্গে বহন করার প্রয়োজন থাকবে না।
  • ফটোকপি জমা দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলবে।
  • ঘরে বসেই তথ্য আপডেট করা যাবে।
  • জালিয়াতি ও তথ্যের অপব্যবহার কমবে।
  • সরকারি প্রকল্পে আরও দ্রুত ও সহজে সুবিধা পাওয়া যাবে।

বর্তমান ভারত ডিজিটাল হচ্ছে তাই সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগের অন্যতম বড় অংশীদার হচ্ছে আধার। আর আধার কার্ড ছাড়া ডিজিটাল ইন্ডিয়া সম্ভব নয়। এই নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে আধার কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং ডিজিটাল জীবনের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে। সরকারি ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা কিংবা আর্থিক লেনদেন—সব ক্ষেত্রেই আধার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আধার কার্ডে আসন্ন এই পরিবর্তন ভারতের নাগরিকদের কাছে এক বড় স্বস্তির খবর। আপনার কাছে যদি আধার কার্ড থেকে থাকে তাহলে আপনিও এই পরিবর্তনগুলো করে নিতে পারবেন। প্রযুক্তির সাহায্যে এখন পরিচয় যাচাই আরও সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ হবে। নিজের ইচ্ছামত পরিবর্তন করে নিতে পারবেন কোথাও যেতে হবে না এর জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এক বড় পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আরও সহজ করে তুলবে।